আক্বীদা

بسم الله الرحمن الرحيم

আক্বীদা (العقيدة) অর্থ দৃঢ় বিশ্বাস, যা ধারণ করে মানুষের জীবন পরিচালিত হয়। আদম-সন্তানহিসাবে দুনিয়ার সকল মানুষ সমান। কিন্তু আক্বীদা ও বিশ্বাসের পার্থক্যের কারণে তাদের কেউ মুমিন, কেউ কাফির। যারা মুমিন তারা আল্লাহকে তাদের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা হিসাবে দৃঢ় বিশ।বাস পোষণ করেন এবং তাঁর প্রেরিত বিধান সমূহ মেনে চলেন। পক্ষান্তরে যারা কাফির, তারা আল্লাহ ও তাঁর বিধানসমূহ অমান্য করে ও নিজেদের খেয়াল-খুশীমত চলে।

১. একজন মানুষকে মুসলমান হতে গেলে প্রথমে তাকে দু’টি বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে হয়। যাকে কালেমায়ে শাহাদাত বলা হয়। اَشْهَدُ اَنْ لآ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ وَ اَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.‘আশ্হাদু আল লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহূ ওয়া রাসূলুহু’।

অনুবাদ : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।

২. ইসলামের ভিত্তি হ’ল পাঁচটি। যা তাকে মেনে চলতে হয়। যেমন (১) এই মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। (২) দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করা (৩) মালের যাকাত আদায় করা (৪) রামাযানের ছিয়াম পালন করা (৫) হজ্জ করা।

১. একজন মুসলমানকে নিম্নোক্ত ৬টি বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। যাকে ঈমানে মুফাচ্ছাল বা বিস্তারিত ঈমান বলা হয়। যেমন, آمَنْتُ بِاللهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ مِنَ اللهِ تَعَالَى. ‘আ-মানতু বিল্লা-হি ওয়া মালা-ইয়াকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ওয়াল ক্বাদরি খায়রিহি ওয়া শার্রিহি মিনাল্লা-হি তা‘আলা’

অনুবাদ : আমি ঈমান আনলাম (১) আল্লাহর উপরে (২) তাঁর ফেরেশতাগণের উপরে (৩) তাঁর প্রেরিত কিতাব সমূহের উপরে (৪) তাঁর রাসূলগণের উপরে (৫) ক্বিয়ামত দিবসের উপরে এবং (৬) আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত তাক্বদীরের ভালমন্দের উপরে’।

অর্থাৎ একজন মুসলমানের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি হ’ল ৬টি : (১) আল্লাহর উপরে বিশ্বাস (২) তাঁর ফেরেশতাগণের উপরে বিশ্বাস (৩) তাঁর প্রেরিত কিতাব সমূহের উপরে বিশ্বাস (৪) তাঁর প্রেরিত রাসূলগণের উপরে বিশ্বাস (৫) ক্বিয়ামত দিবসের উপরে বিশ্বাস এবং (৬) তাক্বদীরের ভাল-মন্দের উপরে বিশ্বাস।

২. ব্যাখ্যা : (১) আল্লাহর উপরে বিশ্বাস এই মর্মে যে, তিনি এক। তার কোন শরীক নেই। তিনি কারু পিতা বা সন্তান নন। তিনি মুখাপেক্ষীহীন। তার সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি জগতসমূহের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রূযীদাতা, রোগ ও আরোগ্যদাতা, বিপদহন্তা, জীবন ও মরণদাতা। তিনি আদি, তিনি অন্ত, তিনি প্রকাশ্য, তিনি গোপন, তিনি সকল বিষয়ে অবহিত। তিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্বচরাচরের ধারক। তাঁর তন্দ্রা নেই, নিদ্রা নেই, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের সকল চাবিকাঠি তাঁর হাতে। তিনি সৃষ্টিজগতের ব্যবস্থাপক ও পরিচালক, তিনি আসমান ও যমীনকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনয়ন করেছেন। তিনি যা খুশী তাই করেন। তিনি যখনই বলেন, হও, তখনি তা হয়ে যায়। তিনি সর্বোচচ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি রাজাধিরাজ, তিনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দেন, যার কাছ থেকে ইচ্ছা তা ছিনিয়ে নেন। তিনি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন, যাকে ইচ্ছা অসম্মানিত করেন। তাঁর হাতেই রয়েছে সকল ক্ষমতা। তিনি পবিত্র, তিনি রক্ষক, তিনি পরাক্রান্ত, তিনি সবার চেয়ে বড়। তিনি সবকিছু দেখেন ও শোনেন, তিনি সর্বজ্ঞ, তিনি প্রজ্ঞাময়। তিনি উদ্ভাবক, তিনি রূপায়ক, তিনি আকৃতিদাতা, তিনি সন্তানদাতা, তিনি মহামহিম। সবকিছুই ধ্বংস হবে তিনি ব্যতীত। সকলে তাঁর কাছেই ফিরে যাবে। তিনি সাত আসমানের উপরে আরশে সমুন্নীত। কিন্তু তাঁর জ্ঞান ও শক্তি সর্বত্র বিরাজমান। তিনি শূন্য সত্তা নন। তাঁর আকার আছে। তাঁর নিজস্ব নাম ও গুণাবলী আছে। যা কারু সাথে তুলনীয় নয়। তিনি আল্লাহ। এটি তাঁর সত্তাগত নাম। এই নামের কোন অনুবাদ নেই। এর কোন লিঙ্গ ও বচন নেই। দুনিয়াতে মানুষ কখনোই তাঁকে দেখতে পাবে না। তবে ক্বিয়ামতের দিন মুমিনগণ তাঁকে স্পষ্ট দেখতে পাবেন, যেভাবে মেঘমুক্ত রাতে পূর্ণিমার চাঁদ স্পষ্ট দেখা যায়। তিনি শান্তিদাতা, তিনি নিরাপত্তা দানকারী, তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী, তিনি দ্রুত প্রতিশোধ গ্রহণকারী। স্বীয় ক্রোধের উপর তার রহমত সর্বদা বিজয়ী। তিনি সর্বাধিক তওবা কবুলকারী। তিনি মহা পবিত্র, তিনি মহিয়ান, তিনি গরিয়ান। তিনি সবকিছুর উপরে ক্ষমতাশালী। সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল ‘আযীম

আল্লাহর নির্ভেজাল একত্ববাদকে ‘তাওহীদ’ বলা হয়। যাকে তিন ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ১. তাওহীদে রবূবিয়াত ২. তাওহীদে ইবাদত ও ৩. তাওহীদে আসমা ওয়া ছিফাত। ১. আল্লাহকে রব হিসাবে অর্থাৎ সৃষ্টি ও পালনকর্তা, রূযীদাতা, জীবন ও মরণদাতা, রোগ ও আরোগ্যদাতা প্রভৃতি হিসাবে বিশ্বাস করা। কিছু সংখ্যক নাস্তিক ছাড়া দুনিয়ার প্রায় সকল মানুষ এই তাওহীদে বিশ্বাস করে। আরবের মুশরিকরাও এ বিশ্বাস করত। কিন্তু স্রেফ তাওহীদে রবূবিয়াতের উপর ঈমান আনলেই কেউ মুমিন হতে পারেনা, যতক্ষণ না সে তাওহীদে ইবাদতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। ২. তাওহীদে ইবাদতের অর্থ হ’ল, সর্ব প্রকার ইবাদতের জন্য আল্লাহকে একক গণ্য করা। আল্লাহর জন্য সর্বাধিক ভালোবাসা সহ চরম প্রণতি পেশ করাকে ‘ইবাদত’ বলা হয়। বিশ্বাস ও কর্মজগতের সর্বত্র এককভাবে আল্লাহর দাসত্ব করাকে তাওহীদে ইবাদত বলা হয়। ৩. তাওহীদে আসমা ওয়া ছিফাত অর্থ আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর একত্ব। অর্থাৎ আল্লাহর সত্তাগত ও কর্মগত গুণাবলী আল্লাহর সত্তার সাথে অবিচ্ছিন্ন ও ক্বাদীম। তা বান্দার সত্তা ও গুণাবলীর সাথে তুলনীয় নয়। এ বিষয়ে কোন রূপক ও কল্পিত ব্যাখ্যা ছাড়াই পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ সমূহে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই প্রকাশ্য অর্থে বিশ্বাস স্থাপন করা।

২. তাঁর ফেরেশতাগণের উপর বিশ্বাস :

ফেরেশতাগণ নূরের তৈরী আল্লাহর এক অনন্য সৃষ্টি। যারা আমাদের অলক্ষ্যে থেকে আমাদের সেবায় নিয়োজিত আছে। যারা সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে এবং তাঁর হুকুম পালনে সদা তৎপর থাকে। যারা আল্লাহর কন্যা নয় বা তাঁর শরীক নয়। আল্লাহর হুকুম ব্যতীত তারা কারু কোন মঙ্গল বা অমঙ্গল করার ক্ষমতা রাখেনা। আল্লাহ তাদেরকে মানুষের দৃষ্টির অগোচরে রেখেছেন। কিন্তু কখনো কখনো তিনি উক্ত পর্দা উঠিয়ে নেন বিশেষ কোন বান্দার ক্ষেত্রে। যেমন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ফেরেশতাগণের সর্দার জিব্রীলকে তার ছয়শত ডানা সহ স্বরূপে দেখেছিলেন, যা দিগন্ত ঢেকে ফেলেছিল। অনেক সময় তাঁরা মানুষের বেশ ধরে হাযির হন। যেমন জিব্রীল হাযির হয়েছিলেন মারিয়ামের কাছে ও তাঁর সাথে কথোপকথন করেছিলেন। যেমন তিনি হাযির হয়েছিলেন হেরা গুহাতে প্রথম ‘অহি’ নিয়ে। এসেছিলেন মানুষের বেশ ধরে রাসূল (ছাঃ)-এর বৈঠকে। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সকলকে ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও ক্বিয়ামতের আলামত সমূহ জানিয়ে দেবার জন্য। হযরত ওমর (রাঃ) সহ ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলে এদৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন।

তারা আল্লাহর হুকুমে বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব পালন করেন। যেমন (১) ফেরেশতাগণের সর্দার জিব্রীল (আঃ) আল্লাহর নিকট থেকে অহি নিয়ে বিভিন্ন নবী ও রাসূলের নিকট আগমন করেন। এতদ্ব্যতীত বিভিন্ন জনপদ ধ্বংস করার কাজও আল্লাহ তাঁকে দিয়ে করান। যেমন হূদ, ছালেহ, লূত্ব, শো‘আয়েব প্রমুখ নবীগণের অবাধ্য কওমকে তিনি ধ্বংস করে দেন। এছাড়াও রয়েছে তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা আল্লাহ তাকে দিয়ে থাকেন। (২) মীকাঈল ফেরেশতা বৃষ্টিপাত ও শস্য উৎপাদনের দায়িত্বে আছেন। (৩) ইস্রাফীল ক্বিয়ামতের দিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার অপেক্ষায় নিয়োজিত আছেন। (৪) ‘মালাকুল মউত’ সর্বদা প্রাণীর রূহ কবয করার কাজে নিযুক্ত আছেন। (৫) ‘মালাকুল জিবাল’ পাহাড় সমূহের নিয়ন্ত্রণ করেন। (৬) ‘মালেক’ ফেরেশতা জাহান্নামের দারোগা হিসাবে নিয়োজিত আছেন। (৭) একদল ফেরেশতা মায়ের গর্ভে সন্তানের অবয়ব গঠনে নিযুক্ত আছেন। (৮) একদল ফেরেশতা মায়ের গর্ভে ১২০ দিনের মাথায় সন্তানের দেহে রূহ সঞ্চার ও তার কপালে ৪টি বিষয়ে তাক্বদীর লিপিবদ্ধ করণে নিযুক্ত আছেন। উক্ত চারটি বিষয় হ’ল বান্দার আয়ুষ্কাল, তার কর্মকান্ড, তার রিযিক এবং সে সৌভাগ্যবান না হতভাগা (জান্নাতী না জাহান্নামী)।

(৯) একদল ফেরেশতা সর্বদা মানুষের হেফাযতে রত আছেন। (১০) একদল ফেরেশতা মানুষের আমল সমূহ লিপিবদ্ধ করেন। প্রত্যেক মানুষের সাথে ডাইনে ও বামে দু’জন ফেরেশতা থাকেন ভাল ও মন্দ কর্ম লিপিবদ্ধ করার জন্য। (১১) মুনকার ও নাকীর নামে একদল অপরিচিত ফেরেশতা মানুষের মৃত্যুর পর কবরে তাকে তিনটি বিষয় জিজ্ঞাসাবাদে নিয়োজিত আছেন। তার রব কে? তার দ্বীন কি? ও শেষনবী কে ছিলেন? একদল ফেরেশতা জান্নাতবাসীদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন।

এভাবে ফেরেশতাগণের কাজের কোন শেষ নেই। তেমনি তাদের সংখ্যারও কোন শেষ নেই। যেমন হাদীছে এসেছে যে, সপ্তম আকাশে অবস্থিত বায়তুল মা‘মূরে প্রতিদিন সত্তুর হাযার ফেরেশতা ছালাত আদায় করেন। অথচ ভিড়ের কারণে পুণরায় তারা আর সেখানে ফিরে আসতে পারেন না। এমনিভাবে লাখো ফেরেশতা সর্বদা আল্লাহর হুকুম পালনে রত আছেন। لَا يَعْصُوْنَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُوْنَ ‘যারা আল্লাহ যা আদেশ করেন তার অবাধ্যতা করেন না এবং তারা সর্বদা সেই কাজ করেন, যা করতে তাদের আদেশ করা হয়’ (তাহরীম ৬৬/৬)

৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের উপরে বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের উপর কিতাব সমূহ নাযিল করেছিলেন জগদ্বাসীর জন্য পথপ্রদর্শক হিসাবে এবং আমলকারীদের জন্য প্রমাণ হিসাবে। যার মাধ্যমে তারা জীবন পরিচালনা এবং নিজেদের আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করে। বড় বা ছোট কিতাব বা ছহীফা তিনি সকল নবী-রাসূলের উপর নাযিল করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ … ‘নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও তূলাদন্ড যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে’ … (হাদীদ ৫৭/২৫)

সকল কিতাব ও ছহীফার নাম আল্লাহ আমাদের জানাননি। যেগুলির নাম তিনি আমাদের জানিয়েছেন, সেগুলি নিম্নরূপ :

(১) ইবরাহীম (আঃ)-এর ছহীফা সমূহ। যা তাঁর উপর ছোট পুস্তিকা আকারে নাযিল হয়।

(২) তাওরাত : নবী মূসা (আঃ)-এর উপর এই কিতাব নাযিল হয়। এটাই হ’ল বনু ইস্রাঈলগণের শ্রেষ্ঠ কিতাব। এর মধ্যে ব্যবহারিক জীবন পরিচালনার বিভিন্ন আইন ও বিধান সমূহ নাযিল হয়।

(৩) যবূর : এটি দাঊদ (আঃ)-এর উপর নাযিল হয়। যা তাওরাতেরই পরিপূরক।

(৪) ইনজীল : এটি বনু ইস্রাঈলের শেষ নবী ঈসা (আঃ)-এর উপর নাযিল হয়। এতে তাওরাতের অনেক হারামকে হালাল করা হয় ও নতুন বিধান সমূহ জারি করা হয়। যবূর ও ইনজীল প্রত্যেক কিতাবই তাওরাতের সত্যায়নকারী ও পূর্ণতাদানকারী ছিল। তবে প্রত্যেক কিতাবই স্ব স্ব অনুসারীদের হাতে বিকৃত ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

(৫) কুরআন : এটি হ’ল শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর নাযিলকৃত আল্লাহর সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ কিতাব। যা বিগত সকল ইলাহী কিতাবের সত্যায়নকারী। মানবজাতির জন্য সুপথ প্রদর্শনকারী এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। এই কিতাব প্রেরণের মাধ্যমে আল্লাহ বিগত সকল কিতাবের হুকুম রহিত করেছেন এবং এই কিতাবের হেফাযতের দায়িত্ব আল্লাহ স্বয়ং নিয়েছেন। ফলে তা বিকৃতকারীদের বিকৃতি হ’তে নিরাপদ রয়েছে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টিজগতের উপর ইলাহী দলীল হিসাবে মওজূদ থাকবে। বিগত সকল কিতাবের হুকুম ছিল সাময়িক ও পরিবর্তনীয়। কিন্তু কুরআনের হুকুম ও বিধানসমূহ হ’ল চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়। আল্লাহ বলেন, وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ‘তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায় দ্বারা পূর্ণ। তাঁর বাণীর পরিবর্তনকারী কেউ নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন’ (আন‘আম ৬/১১৫)

৪. তাঁর রাসূলগণের উপর বিশ্বাস :

প্রত্যেক মুসলমানকে এই অপরিহার্য বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত কিছু মানুষের মাধ্যমেই মানবজাতির নিকটে তাঁর বাণী পাঠিয়েছেন। যাদেরকে নবী ও রাসূল বলা হয়। যার অর্থ দূত বা সংবাদ বাহক। নবীগণ আল্লাহর নিকট থেকে ‘অহি’ প্রাপ্ত হন। যা ফেরেশতা জিব্রীল মারফত তাদের অন্তরে প্রক্ষিপ্ত হয়। কখনো কখনো জিব্রীল সরাসরি আসেন ও কথা বলেন। কখনো স্বপ্নাদেশ হয়। কোন কোন নবীর সাথে আল্লাহ দুনিয়াতেই সরাসরি কথা বলেছেন। যেমন মূসা (আঃ)। কোন কোন নবীকে আল্লাহ নিজের কাছে ডেকে নিয়ে কথা বলেছেন। যেমন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)।

নবীগণ মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন। তাঁরা নিষ্পাপ ও মা‘ছূম ছিলেন। তাঁরা মানুষকে আল্লাহর বাণী শুনাতেন এবং সর্বদা জাহান্নামের ভয় ও জান্নাতের সুসংবাদ শুনাতেন। তাঁরা নূরের নবী ছিলেন না। তাঁরা গায়েব জানতেন না। কেবল অতটুকুই জানতেন, যতটুকু আল্লাহ তাদের জানাতেন। মানুষকে সর্বদা আল্লাহর পথে ডাকার কারণে শয়তানের তাবেদার একদল নেতৃস্থানীয় মানুষ সর্বদা তাদের কষ্ট দিয়েছে। এমনকি তাদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। তবুও তাঁরাই সর্বদা জগদ্বাসীর অনুসরণীয়, বরণীয় ও শ্রদ্ধার পাত্র। ৩১৫ জন রাসূলসহ পৃথিবীতে সর্বমোট ১ লক্ষ ২৪ হাযার নবী এসেছেন। আদি পিতা আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী। নূহ (আঃ) ছিলেন প্রথম রাসূল। নূহের প্লাবনের পরবর্তী মানবজাতির সবাই নূহ (আঃ)-এর বংশধর। ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন আবুল আম্বিয়া বা নবীগণের পিতা। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর বংশধর হ’লেন ইয়াকূব, ইউসুফ, মূসা, দাঊদ, সুলায়মান, ঈসা প্রমুখ নবী ও রাসূলগণ। তন্মধ্যে মূসা, দাঊদ ও ঈসা (আঃ) হ’লেন কিতাবধারী রাসূল। ইহুদী-খ্রিষ্টানরা তাঁদের উম্মত হবার দাবীদার। ইবরাহীম (আঃ)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর হ’লেন শেষনবী ও শ্রেষ্ঠনবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম

সকল নবী ছিলেন স্ব স্ব গোত্রের নবী। কিন্তু শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন বিশ্বনবী। তাঁর আগমনবার্তা বিগত কিতাব সমূহে লিপিবদ্ধ ছিল। বিগত সকল নবীর কাছ থেকেই শেষনবীর প্রতি ঈমান ও আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল। শেষনবীর আগমনের পর বর্তমান বিশ্বের সকল মানুষ কেবল তাঁরই উম্মত। তাঁর ও তাঁর আনীত দ্বীনের উপর ঈমান না আনলে সবাই জাহান্নামী হবে। আখেরী যামানায় ৩০ জন ভন্ডনবীর আবির্ভাব ঘটবে বলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে সাবধান করে গেছেন। ইতিমধ্যে তাদের কয়েকজনের আবির্ভাব ঘটে গেছে ও বহু মানুষকে তারা পথভ্রষ্ট করেছে। যেমন ভারতের গোলাম আহমাদ ক্বাদিয়ানী (আল্লাহ তাকে লা‘নত করুন!)। নবীগণকে আল্লাহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং একে অপরের উপর মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু আল্লাহর নবী হিসাবে সকলকে আমরা সমান ভাবে বিশ্বাস করি, মান্য করি ও শ্রদ্ধা করি। আমরা কাউকে পার্থক্য করি না।

শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আনীত ‘ইসলাম’ বর্তমানে মানবজাতির জন্য আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন, যা পূর্ণাঙ্গ। এর বাইরে যে ব্যক্তি অন্য দ্বীন তালাশ করবে, সে ব্যক্তি আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পরে তাঁর রেখে যাওয়া কুরআন ও সুন্নাহ মানবজাতির জন্য একমাত্র অনুসরণীয় ও পালনীয়। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন। আমীন!

৫. ক্বিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস :

এটি পুনরুত্থান দিবস। এ দিবসের পর আর কোন দিবস নেই। এরপর থেকে শুরু হবে চিরস্থায়ী জীবন। হয় জান্নাতে, নয় জাহান্নামে। যেখানে আর কোন মৃত্যু নেই বা জন্ম নেই। এদিন ইস্রাফীলের ২য় ফুঁক দেওয়ার সাথে সাথে সকল মানুষ স্ব স্ব কবর থেকে উঠে নগ্ন অবস্থায় আল্লাহর নিকটে সমবেত হবে। অতঃপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রথম কাপড় পরিহিত হবেন। অতঃপর পরবর্তী মুমিনগণ। অতঃপর আল্লাহর হুকুমে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শাফা‘আতক্রমে  (الشفاعة العظمى)আল্লাহ বিচারকার্য শুরু করবেন এবং বিচারের দাড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে। অতঃপর মানুষের সৎকর্ম ও অসৎকর্ম সমূহ ওযন করা হবে। সরিষাদানা পরিমাণ সৎকর্ম করলেও সেদিন তা দেখা হবে, অসৎকর্ম করলেও তা দেখা হবে। কারু প্রতি সামান্যতম যুলুম করা হবে না। অতঃপর যার সৎকর্মের পাল্লা ভারি হবে, তাকে ডানহাতে আমলনামা দেওয়া হবে। অন্যথায় বামহাতে আমলনামা দেওয়া হবে।

অতঃপর আল্লাহ তার পায়ের নলা বের করে দিয়ে সেখানে সবাইকে সিজদা করতে বলবেন। কিন্তু দুনিয়াতে যারা কারু ভয়ে বা লোক দেখানো ছালাত আদায় করত, তাদের মেরুদন্ডের হাড় শক্ত তক্তার ন্যায় হয়ে যাবে। ফলে তারা সিজদা করতে ব্যর্থ হবে। পক্ষান্তরে মুত্তাক্বীগণ সহজে সিজদা করবে। অতঃপর সবাইকে জাহান্নামের উপর দিয়ে পুলছেরাত পার হতে বলা হবে। সেখানে ডানহাতে আমলনামা প্রাপ্তগণ চোখের পলকে পার হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু বামহাতে আমলনামা প্রাপ্তগণ পুলছেরাতের আংটায় আটকে যাবে ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে এবং সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। অতঃপর কবীরা গোনাহগার মুমিন, যারা জাহান্নামে পতিত হয়েছে, তাদের মুক্তির জন্য শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর নিকটে শাফা‘আত করবেন। ফলে তাদের অনেকে আল্লাহর রহমতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে ফিরে আসবে। যদিও তারা সেখানে ‘জাহান্নামী’ (الجهنميون) বলে পরিচিত হবে। অতঃপর অন্যান্য নবী, ফেরেশতা ও মুমিনগণ সুফারিশ করবেন ও তা কবুল করা হবে (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৫৭৯)। এভাবে প্রায় সকল পাপী মুমিন তাদের খালেছ ঈমানের কারণে এক সময় জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে জান্নাতে ফিরে আসবে। অবশেষে কোনরূপ শাফা‘আত ছাড়াই আল্লাহ তাঁর স্বীয় রহমতে ঐসব বড় পাপী মুমিনদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন, যাদের অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ ঈমান ছিল এবং যারা খালেছ অন্তরে পড়েছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এদেরকে বলা হবে (عتقاء الرحمن) বা আল্লাহর মুক্ত বান্দাগণ’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হ/৫৫৭৬; ৫৫৭৯; বুখারী, মিশকাত হা/৫৫৭৪)

এদিন হাউয কাউছার স্থাপন করা হবে। যা জান্নাতের একটি বিশাল পানির হাউয। যার দৈর্ঘ্য একমাসের পথ ও প্রস্থ একমাসের পথ। যার পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি, মিশকের চাইতে সুগন্ধিময়। যার পানপাত্র সমূহ আকাশের নক্ষত্র সমূহের ন্যায় সুন্দর ও অসংখ্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জান্নাতী মুমিনগণকে এই হাউযের পানি পান করাবেন। যারা পান করবে, তারা আর কখনোই পিপাসার্ত হবে না। কিন্তু বিদ‘আতী মুমিনগণ সেখানে উপস্থিত হলেও এবং তাদের ওযূর অঙ্গগুলির ঔজ্জ্বল্য দেখে রাসূল (ছাঃ) তাদের পানি পান করাতে চাইলেও  ফেরেশতাগণ তাদের ফিরিয়ে দিয়ে বলবেন, আপনি জানেন না তারা আপনার পরে দ্বীনের মধ্যে কত অসংখ্য বিদ‘আত সৃষ্টি করেছিল। তখন রাসূলুললাহ (ছাঃ) তাদের ধিক্কার দিয়ে বলবেন, দূর হও, দূর হও, যারা আমার পরে আমার দ্বীনকে বিকৃত করেছ’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৫৭১ ‘হাউয ও শাফা‘আত’ অনুচ্ছেদ)

জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্ট অবস্থায় আছে ও থাকবে চিরদিন। যা কখনোই ধ্বংস হবে না। জাহান্নামকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন অবিশ্বাসী কাফির-মুশরিক, মুনাফিক ও পাপীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দানের জন্য। মুমিন পাপীরা শাফা‘আতের কারণে ক্রমে মুক্তি পেলেও অবিশ্বাসী কাফির-মুশরিক ও মুনাফিকরা চিরকাল সেখানে শাস্তি ভোগ করবে (নিসা ৪/১৪০, ১৪৫)। জাহান্নামের সর্বনিম্ন শাস্তি হবে এই যে, পাপীর দু’পায়ে আগুনের জুতা পরানো হবে। তাতেই তার মাথার ঘিলু টগবগ করে ফুটবে (বুখারী, মিশকাত হা/৫৬৬৮)। তাদের খাদ্য হবে বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত শুকনা যরী‘ ঘাস ও যাক্কুম বৃক্ষ, যা তাদেরকে পুষ্ট করবেনা বা ক্ষুদাও মিটাবেনা। তাদের পানীয় হবে উুত্তপ্ত ও ফুটন্ত পানি এবং দেহ নিঃসৃত দুর্গন্ধময় পুঁজ ও রক্ত (ওয়াক্বিয়াহ ৫৬/৫২-৫৫; হাক্বাহ ৬৯/৩৬-৩৭; নাবা ৭৮/২৫; গাশিয়াহ ৮৮/৫-৭)

আর জান্নাতকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তার মুমিন-মুত্তাক্বী সৎকর্মশীল বান্দাদের পুরস্কৃত করার জন্য। তিনি বলেন,أَعْدَدْتُ لِعِبَادِى الصَّالِحِيْنَ مَا لاَ عَيْنَ رَأَتْ، وَلاَ أُذُنَ سَمِعَتْ، وَلاَ خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ  আমি আমার সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য এমনসব নে‘মত প্রস্ত্তত করে রেখেছি, যা কোন চক্ষু কখনো দেখেনি, কর্ণ কোনদিন শোনেনি, মানুষের অন্তর যা কখনো কল্পনা করেনি (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬১২)। আল্লাহ বলেন, فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ  কেউ জানে না তার কর্মের প্রতিদান হিসাবে তার জন্য চক্ষু শীতলকারী কত নে‘মত লুক্কায়িত রাখা হয়েছে’ (সাজদাহ ৩২/১৭)। জান্নাতের একশত স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ স্তর হ’ল ফেরদৌস। তার উপরেই রয়েছে আল্লাহর আরশ (বুখারী, তিরমিযী, মিশকাত হ/৫৬১৭)। যেখানে আল্লাহ সমুন্নীত হন। জান্নাতের একটি চাবুক রাখার স্থান গোটা দুনিয়া ও তার সবকিছুর চাইতে উত্তম (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬১৩, বঙ্গানুবাদ হা/৫৩৭২)। ঈমানদারগণের সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত হবে তখন, যখন তারা আল্লাহকে সরাসরি দেখবে’ (ক্বিয়ামাহ ৭৫/২৩)। কিন্তু অবিশ্বাসীরা তাঁকে দেখতে পাবেনা (মুত্বাফফেফীন ৮৩/১৫)

৬. আল্লাহ নির্ধারিত তাক্বদীরের ভাল-মন্দের উপর বিশ্বাস। অর্থাৎ আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ বান্দার ভাল-মন্দ সবকিছু পূর্ব থেকে জানেন। তিনি তার সবকিছু নির্দিষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি ভাল-মন্দ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। ‘আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বছর পূর্বে আল্লাহ বান্দার তাক্বদীর লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৭৯ ‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ)। আল্লাহ বলেন, وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُبِينٍ ‘আর প্রত্যেক বস্ত্ত আমরা স্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছি’ (ইয়াসীন ৩৬/১২)।

আল্লাহ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালের গন্ডীতে আবদ্ধ নন। তাই বান্দার অতীত ও ভবিষ্যৎ সবকিছু তিনি জানেন। কিন্তু বান্দা সেটা জানেনা। ফলে তাকে সাধ্যমত আল্লাহর হুকুম মেনে কাজ করে যেতে হয় ও তার নৈকট্য হাছিলের চেষ্টা করতে হয়। আল্লাহ তাকে তার জ্ঞান মতে কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। যার ভিত্তিতে সে পরকালে জান্নাত বা জাহান্নামের অধিকারী হয়। যাকে আল্লাহ জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, দুনিয়াতে সেকাজ তার জন্য সহজ হয় এবং মৃত্যুর পূর্বে সে জান্নাতী আমল করে। আর যাকে আল্লাহ জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য সেকাজ সহজ হয় এবং মৃত্যুর পূর্বে সে জাহান্নামী আমল করে। ইতিপূর্বে সে যেকাজই করুক না কেন তার শেষ আমলটাই আল্লাহর নিকটে গৃহীত হয়।

তাক্বদীরে বিশ্বাসের ফলাফল এই হয় যে, সাধ্যমত চেষ্টার পর ব্যর্থ হ’লে তাক্বদীরের লিখন ছিল বলে সে স্বস্তিলাভ করে। সফলতায় সে অহংকারী হয় না। বরং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। ব্যর্থতায় সে ভেঙ্গে পড়েনা বা হতাশ হয় না। কেননা সে বিশ্বাস করে যে, এটাই আল্লাহর পূর্ব নির্ধারিত ছিল। আল্লাহ যেটা চেয়েছেন সেটাই হয়েছে। বান্দার এতে কিছুই করার নেই। এভাবে সফলতা ও ব্যর্থতা সর্বাবস্থায় সে একটি সুসমন্বিত (well-balanced) জীবন যাপন করে। সকল অবস্থায় আল্লাহর উপরে ভরসাকারী একজন সুখী মানুষ হিসাবে সে জীবন অতিবাহিত করে। আল্লাহ আমাদেরকে কবুল করুন –আমীন!

 -লেখক : মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন